Subcribe to our RSS feeds Join Us on Facebook Follow us on Twitter Add to Circles

Thursday, June 18, 2015

শিশুশ্রম: অকালে হারিয়ে যাওয়া কিছু স্বপ্নের বাস্তবতা


 http://www.amoutsourcefreelance.com/

মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের এক অনন্য সৃষ্টি অন্নদামঙ্গল। এই অন্নদামঙ্গলের একটি উক্তি এমন ছিল “প্রণমিয়া পাটনি কহিছে জোড় হাতে…আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে”।
কথাটি কবি হয়ত সেই সময়ে একটি রূপক আকারে একজন মাঝি চরিত্র ঈশ্বরী পাটনীর মনের সুপ্ত ইচ্ছা হিসেবে তুলে ধরেছিলেন দেবী অন্নপূর্ণার কাছে, কিন্তু খুব গভীরভাবে যদি কথাটি আমরা অবলোকন করি তাহলে দেখতে পাব, হয়তবা এই ছোট্ট কিন্তু আবেগপূর্ণ চাওয়াটা প্রায় প্রত্যেক মা-বাবার ক্ষেত্রে তার সন্তানের জন্য প্রযোজ্য। পিতা-মাতার কাছে তার সন্তান অপেক্ষা মূল্যবান জিনিস হয়তবা আর কিছু হয় না-হোক না সে পিতামাতা উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নবিত্ত।
কিছু কিছু বিচ্ছিন্ন ক্ষেত্র বিশেষ বাদ দিলে দেখা যাবে; যে কোন শ্রেণীর পিতা-মাতার সন্তানকে ঘিরে আবেগ একই- পরিমাণ কোন জায়গায় কিছুটা কম, কোন জায়গায় অনেক পরিমাণে বেশি। পক্ষান্তরে, পৃথিবীতে এই সন্তানগুলোই সমাজের কাছে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ধরা যাক, উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের কোন পরিবারের সন্তানের কথা, তাদের প্রতিদিনকার কাজের মধ্যে ঘুম থেকে উঠা, মা-বাবার সাথে স্কুলে যাওয়া, স্কুল থেকে ফিরে এসে কিছু সময় আরাম করার ছলে খেলতে যাওয়া বা কার্টুন দেখা, ফিরে এসে আবার স্কুলের যাবতীয় হোমওয়ার্ক করা, এরপর রাতের খাবার খেয়ে ঘুমাতে যাওয়া প্রভৃতি কাজ প্রায় বাঁধাধরা নিয়মে পড়ে।
কিন্তু আমাদের সমাজে এসব শিশু বাদেও এমন কিছু শ্রেণীর শিশু রয়েছে, যাদের কাছে এরকম জীবন কল্পনাতীত। নিম্নবিত্ত সমাজের অবহেলিত শিশুশ্রেণীর কাছে এ যেন এক রূপকথার গল্প। যখন তাদের স্কুলের যাওয়ার বয়স, তাদের সকালে ঘুম থেকে উঠে স্কুলের শিক্ষকের বদলে হাজিরা দিতে যেতে হয় মালিকের কাছে “ মালিক আমি আইলাম”! এরপর শিক্ষকের স্থলে মালিকের প্রত্যুত্তর হয় “ লেগে যা কাজে” ! আমাদের সমাজের এই করাল বাস্তবতার অপর নাম শিশুশ্রম এবং আর দশটা উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত বাচ্চাদের সাথে পার্থক্য তাদের পরিচয়ে কারণ তারা শিশুশ্রমিক। এদের দেখা কোথায় পাওয়া যায়না বলতে পারবেন?? কারও গার্মেন্টসে গেলে দেখা মিলবে, কারও দেখা মিলবে লোহার ঝালাইয়ের দোকানে গেলে, কারও ইটের ভাটাতে, কারও দেখা পাওয়া যাবে পেপার বিক্রেতা হিসেবে, আবার কারও চায়ের দোকানে সাহায্যকারী হিসেবে।
অপরদিকে, বয়সের জরিপ করতে গেলে দেখা যাবে, ৫ বছর বয়সী ছেলে চায়ের দোকানে চা দিয়ে বেড়াচ্ছে, অথবা ৮ বছর বয়সী কেউ নিজের স্বাস্থ্যের ঝুঁকি নিয়ে লোহা ঝালাইয়ের কাজ করছে। কেন করছে এগুলো তারা, কখনও কি আমরা তাদের এই প্রশ্নটা করে দেখেছি ? উপরন্তু আমাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক মানুষ রয়েছে যারা এদের অপরিপক্ব কাজের ধরণ দেখে আবার দোকানদারকে বলে আসে “ এই অমুকের বাচ্চাকে কি দেখে রেখেছেন, সময় মত চা টেবিলে দিতে পারে না বা টেবিলে চা ফেলেছে আজকে..” !
পক্ষান্তরে আমাদের মধ্যে কেউ কি ভেবে দেখে, কেন তারা তাদের শৈশবের রঙ্গিন স্বপ্ন, ছেলেবেলার ক্ষুদে ক্ষুদে ইচ্ছাগুলোকে জলাঞ্জলি দিয়ে পরের তত্ত্বাবধানে কাজ করছে ?? তারা তো কখনও ভাবেনি তাদের ভবিষ্যতের সূচনা চায়ের দোকানে বা ইটের ভাটাতে বা লোহার ঝালাইয়ের দোকানে শ্রমিক হিসেবে হবে!! এই বয়সে কেন তারা আসে শ্রমিক হিসেবে? সোজাসাপ্টা উত্তর হবে, পেটের তাগিদে আসে।
শরীরের অন্য অংশ সহানুভূতিশীল হলেও পেট যে অত্যন্ত ব্যতিব্যস্ত প্রকৃতির। মানুষ তাদের পৃথিবীর বুকে বোঝা মনে করলেও, তাদের কেউ মাঝ পথে ছেড়ে গেলেও… তারা তাদের ছোট্ট কাঁধটিতে নিজেদের সহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মুখে ভাত তুলে দেয়ার যে সংকল্প নিয়েছে, তাদের স্বপ্নগুলো উৎসর্গ করে। সুতরাং তাদের কাছে একমাত্র পথ অবশিষ্ট থেকে যায়, রোজগার করতে হবে শুধু দুইমুঠো ভাতের জন্য, শ্রমিক হতে হবে বাঁচার জন্য।
রাজশাহী মহানগরীতে খরবনা নামক এলাকার বস্তি ৭ বছর বয়সী সুমনের আবাসস্থল। মা মানুষের বাড়িতে কাজ করে বেড়ায় এবং সে চায়ের দোকানে সাহায্যকারী হিসেবে কাজ করে আসছে তার বাবা সংসার ফেলে রেখে যাওয়ার পর থেকে। পড়াশুনার করার ইচ্ছা আছে কিনা তাকে জিজ্ঞেস করাতে সে প্রত্যুত্তর দেয়, তার সমবয়সী ছেলে মেয়েদের স্কুলে যেতে দেখে তারও মন স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে, কিন্তু অভাবের বাস্তবতা তো তাকে তার স্বপ্নটিকে বাস্তবায়ন করতে দেয় না ! এতকিছুর পরও নিষ্পাপ চোখ দুইটি দিয়ে সে স্বপ্ন দেখে, একদিন এই শ্রমজীবনের বেড়াজাল কেটে নিজের নতুন জীবন তৈরি করবে, অনেক অনেক বড় হবে সে।
অপরদিকে, তারিকের বয়স ১২-র কোঠায়…অল্প বয়সে তার চেহারাতে বয়সের একটা ক্লেশ ভাব পড়ে গেছে, সামনাসামনি দেখলে তাকে অনেক বড় বলে মনে হয়। কিন্তু বয়স জিজ্ঞেস করতে গিয়ে পাওয়া গেল, তার বয়স মাত্র ১২ ! কমবয়সী চেহারায় কাঠিন্যের বাস্তবতার পিছনের কারণ অকাল পরিশ্রম ছাড়া আর কিছু যে নয় তা সহজেই বোঝা যায় ! সে অনেক ছোটকাল থেকেই রাজশাহীর গ্রেটার রোডের একটি স্টিলের ফার্নিচারের দোকানে বর্তমানে রড কাটার কাজ করে। যখন সে কাজে ঢুকেছিল ছোটখাটো কাজ করত। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে সমানুপাতিক হারে তার উপর কাজের পরিমাণও বেড়েছে। এই ছেলেটির তার বয়সী আর দশটি ছেলের মত নিশ্চিন্তে বাঁচার অধিকার কেন নেই একবারও কি কেউ ভেবে দেখেছে ? সব ইচ্ছা, স্বপ্নগুলো কি বিসর্জন যায় শুধু দারিদ্র্যের অপঘাতে?
উপমহাদেশ তথা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিশুশ্রমের বর্তমান পরিস্থিতি অনেক বেশি সংকটময়। ইউনিসেফের ২০০৬-০৭ সালের দেয়া তথ্য মতে, বাংলাদেশে ৫-১৭ বছর বয়সী শিশুশ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৭৪ লাখের কাছাকাছি এবং ৫-১৪ বছর বয়সী শিশু শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৪৭ লাখ। যেসকল শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ কর্মক্ষেত্রে শ্রমিক হিসেবে কাজ করে শুধু তাদের সংখ্যাই ১৩ লক্ষের বেশি। অপরদিকে, বাসাবাড়িতে কাজ করা বাচ্চাদের সংখ্যাটাও নেহাত কম নয়…৪ লক্ষ ২১ হাজার ! এদের মধ্যে ৮৩ শতাংশ শিশুকে গ্রামাঞ্চলে কাজ করতে দেখা যায় এবং ১৭ শতাংশ শিশু শ্রমিক শহর কেন্দ্রিক। শিশু শ্রমিকের সংখ্যা এবং চাহিদা কোন অংশে কম নয় কেন জানেন? প্রাপ্ত বয়সী মানুষকে যদি কোন জায়গায় শ্রমের মূল্য হিসেবে দৈনিক গড়ে ৫০-৬০ টাকা যদি দেয়া হয় মালিকের পক্ষ থেকে, তো এসব শিশু শ্রমিককে মালিকপক্ষ দিনে গড়ে ধমকিয়ে ২০-৩০ টাকা দিয়েই দুইগুণ কাজ করিয়ে নিতে পারে অনায়সেই। মালিকপক্ষের ঝুলিতে লাভ থেকে যায় আরও প্রায় ২০-৩০ টাকার মত !
তাহলে বলুন, দুর্মূল্যের এই বাজারে শিশুশ্রমিকের মত মালিকপক্ষের কাছে লাভের কি কিছু আছে? তাহলে মালিকপক্ষের অর্থনীতি ভালভাবে প্রয়োগ করতে তারা প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিক নিবে কেন? শিশুশ্রম বন্ধ না হওয়ার পিছনে অন্যতম কারণ দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রের সাথে কতিপয় সুবিধাভোগী স্বার্থপর মানুষের দুষ্টচক্র এবং অসৎ চিন্তা। বাংলাদেশে ২০০৬ সালে একটি শ্রম আইন পাশ করা হয় যার মতে, শ্রমিক হওয়ার নুন্যতম বয়স নির্ধারণ করা হয় ১৪ বছর। কিন্তু আজ পর্যন্ত তা শক্তপোক্তভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি কারণ শিশুশ্রমের বৈধ পন্থা একটি থাকলে অবৈধ পন্থা খোলা রয়েছে হাজারটি। ফলে বৈধ গোষ্ঠীর শিশুশ্রম আইন দিয়ে ঠেকানো সম্ভব হলেও অবৈধ পন্থার শিশুশ্রম প্রতিহত অসম্ভব হয়ে পড়ে স্বয়ং আইনের পক্ষেও। শিশুশ্রম প্রতিরোধে সরকার থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে যার মধ্যে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা, খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। কিন্তু তাতেও কি অকাল শ্রমের হাত থেকে সব শিশু রক্ষা পাচ্ছে? এর উত্তর……পাচ্ছে না। শিশুশ্রম বন্ধ করতে হলে কঠোর আইন প্রণয়নের পাশাপাশি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক উন্নয়নেরও প্রয়োজন। শিশুরা একটি দেশের, একটি সমাজের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথিকৃৎ এবং সম্ভাবনার দিশারী। তাই শিশুশ্রম নামের এই অভিশাপ থেকে সুমন, তারিক, রিপন কিংবা মিমদের রক্ষা করতে শুধু সরকারী উদ্যোগ বা আইন প্রণয়ন করলেই চলবে না বরং সর্বকুলের সচেতন মানুষকে এটি বন্ধে এগিয়ে আসতে হবে, কারণ একটি শিশু শুধু তার পিতা মাতারই সম্পদ নয়, সে সমাজেরও এক অমূল্য অংশ।

No comments :

Post a Comment